নেদারল্যান্ডসের রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আইএফএফআর এ এবার নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশের তিনটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ভিন্ন ভিন্ন বিভাগে জায়গা পাওয়ায় শুধু একটি ছবির সাফল্য নয়, বরং দেশের নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্রচর্চার ধারাবাহিক উপস্থিতিরও ইঙ্গিত মিলছে।
উৎসবটি কেন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ
আইএফএফআর বহুদিন ধরেই নতুন ভাষার সিনেমা এবং সাহসী নির্মাতাদের জন্য পরিচিত একটি প্ল্যাটফর্ম। এখানে বড় তারকা বা বড় বাজেটের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গি, গল্প বলার ভঙ্গি এবং সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নতুন প্রশ্ন। বিশ্ব সিনেমার নানা দেশের তরুণ নির্মাতারা এই উৎসব থেকে পরিচিতি পেয়েছেন, তাই এখানে নির্বাচিত হওয়া মানে আন্তর্জাতিক কিউরেশন এবং শিল্পমানের স্বীকৃতি পাওয়া।
তিন বিভাগে বাংলাদেশের তিন ছবি
এবার নির্বাচিত তিনটি ছবির মধ্যে মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের ‘দেলুপি’ আছে ব্রাইট ফিউচার বিভাগে। এই বিভাগে সাধারণত নির্মাতার প্রথম বা দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র জায়গা পায়। রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের রাজনৈতিক থ্রিলার ‘মাস্টার’ আছে বিগ স্ক্রিন কম্পিটিশনে, যেখানে শিল্পমানের পাশাপাশি বড় পর্দায় দর্শক টানার সম্ভাবনাও বিবেচনায় থাকে। আর মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’ জায়গা পেয়েছে উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা টাইগার কম্পিটিশনে, যা নতুন সিনেমার জন্য সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বিভাগগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়।
‘রইদ’ নিয়ে বাড়তি আলোচনার কারণ
টাইগার কম্পিটিশনে জায়গা পাওয়া বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। কারণ এই বিভাগে নির্বাচিত সিনেমাগুলোই উৎসবের মূল প্রতিযোগিতায় বৈশ্বিক ছবিগুলোর সঙ্গে সরাসরি তুলনায় আসে। নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন আগেও ‘হাওয়া’ দিয়ে আলোচনায় ছিলেন, নতুন ছবি নিয়ে উৎসবের এই স্বীকৃতি তাঁর কাজের আন্তর্জাতিক যাত্রাকে আরও শক্ত করতে পারে।
‘মাস্টার’ এবং বড় পর্দার সম্ভাবনা
‘মাস্টার’ যেহেতু নির্বাচন ও রাজনীতি ঘিরে বড় ক্যানভাসে নির্মিত একটি রাজনৈতিক থ্রিলার, তাই বিগ স্ক্রিন কম্পিটিশনে থাকা ছবিটির জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই বিভাগে নির্বাচিত কাজগুলো নেদারল্যান্ডসে থিয়েটার রিলিজ এবং প্রদর্শনী সহায়তার সুযোগও পেতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে ছবির পরবর্তী জীবনকে দীর্ঘ করে।
‘দেলুপি’ এবং স্থানীয় বাস্তবতার বিশ্বযাত্রা
‘দেলুপি’ নির্বাচিত হওয়া দেখাচ্ছে, স্থানীয় মানুষ ও মাটির গন্ধের গল্পও আন্তর্জাতিক উৎসবে জায়গা করে নিতে পারে। ব্রাইট ফিউচারে থাকা মানে নির্মাতার সম্ভাবনা এবং নতুন কণ্ঠস্বরকে উৎসব কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাস্তবতার গল্প, সংস্কৃতি এবং অভিনয়ধারারও নতুন করে পরিচিতি তৈরি হতে পারে।
উৎসবের সময়সূচি এবং সামনে কী
রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এবারের আসর শুরু হবে ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি এবং চলবে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এই সময়ে বিশ্বের নানা দেশের প্রযোজক, পরিবেশক, কিউরেটর ও সমালোচকেরা একসঙ্গে থাকেন, ফলে নির্বাচিত ছবিগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী, বিক্রি এবং পরবর্তী উৎসব সফরের নতুন দরজাও খুলতে পারে।
বাংলাদেশের সিনেমার জন্য বার্তা
একই উৎসবে তিন বিভাগে তিনটি বাংলাদেশি ছবি থাকা প্রমাণ করছে, দেশীয় সিনেমা এখন শুধু স্থানীয় মুক্তির হিসাব নয়, বরং আন্তর্জাতিক কিউরেশন এবং শিল্পভাষার প্রতিযোগিতাতেও ধীরে ধীরে অবস্থান তৈরি করছে। গল্প বলার ধরন, নির্মাণের ভাষা এবং প্রযোজনার সক্ষমতা মিলিয়ে এই অর্জন ভবিষ্যৎ নির্মাতাদের জন্যও একটি শক্ত বার্তা হয়ে থাকল।