বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে লালন করেছেন তাঁর নতুন চলচ্চিত্র দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড এর গল্প। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে চিত্রনাট্য উপস্থাপন ও বৈশ্বিক তহবিল সংগ্রহের পর অবশেষে ছবিটির প্রিন্সিপাল ফটোগ্রাফি সম্পন্ন হয়েছে ঢাকায়। ফিল্মটির আন্তর্জাতিক ফান্ড এসেছে নরওয়ে, জার্মানি, পর্তুগাল, ফ্রান্স ও বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতায়।
জাতীয় পুরস্কারজয়ী তিন তারকা নিয়ে শক্তিশালী অভিনয়সংঘ
চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন, রীকীতা নন্দিনী শিমু এবং সুনেহরা বিনতে কামাল—যাঁরা প্রত্যেকেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত। তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন নবাগত জাইনীন করিম চৌধুরী, যিনি আগে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করলেও এবার প্রথমবার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করছেন।
রুবাইয়াত জানান, “প্রতিটি অভিনেতা আমাকে নিরাপদ অনুভূতি দিয়েছেন। তাঁরা আবেগ, শ্রম ও শিল্পকুশলতার উজাড় দেওয়া পারফরম্যান্স তৈরি করেছেন, যার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।”
এক তরুণীর ভেতরের লড়াই থেকে রহস্যময় নারীর আবির্ভাব
চলচ্চিত্রটির গল্প এগোয় জাই নামের এক তরুণীকে ঘিরে, যিনি বিয়ের স্বপ্ন দেখেন কিন্তু নিজের শরীরের ভয় ও মানসিক অস্থিরতা গোপনে লড়াই করেন। ঘরোয়া প্রতিকার কাজ না করায় তাঁর চাপ বাড়তে থাকে। ঠিক এমন সময়ে একটি বিউটি সেলনে তিনি কল্পনায় দেখতে পান একটি রহস্যময় লম্বা চুলের নারীকে, যে তাকে অনুসরণ করছে যেন। রুবাইয়াতের ভাষায়, ছবিটি আধুনিক নারীর শরীর, মন, সামাজিক প্রত্যাশা ও গভীর অনিরাপত্তার একটি প্রতীকী অনুসন্ধান।
নির্মাতা জানান, ২০০৬ সালে তিনি প্রথম গল্পটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে বানানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি বুঝতে পারেন, গল্পটি আরও বৃহৎ ফরম্যাট দাবি করে। “২১ বছর ধরে এই গল্প আমাকে অনুসরণ করেছে। এখন মনে হচ্ছে এক নীরব অলৌকিক মুহূর্তের মতো এটি অবশেষে তৈরি হলো,” তিনি বলেন।
দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড এর চিত্রগ্রহণ করেছেন পর্তুগিজ চলচ্চিত্রশিল্পী লেওনর টেলেস, যিনি বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভালের গোল্ডেন বেয়ারজয়ী। রুবাইয়াত জানান, টেলেসের সাহসী ও সংবেদনশীল ভিজ্যুয়াল ভাষা ছবিটির আবেগময় ভুবনকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
প্রোডাকশন ডিজাইন করেছেন লেবার অব লাভ এর জনাকি ভট্টাচার্য। সংগীত করেছেন জেমস উইলিয়ামস ও দামীর খান। সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করছেন রাফায়েল মার্টিন হোলগার, যিনি রুবাইয়াতের মেড ইন বাংলাদেশ এর সম্পাদকও ছিলেন।
আন্তর্জাতিক কো প্রোডাকশন ও উৎসবযাত্রার প্রস্তুতি
ছবিটি যৌথভাবে প্রযোজনা করেছে পাঁচ দেশের প্রতিষ্ঠান—লেস ফিল্মস দে লা আফ্রেমিদি (ফ্রান্স), ট্যান্ডেম প্রোডাকশনস (জার্মানি), মিডাস ফিল্মস (পর্তুগাল), বারেন্টসফিল্ম এএস (নরওয়ে) এবং খনা টকিজ (বাংলাদেশ)। ছবিটি ডিসেম্বরে ফ্রান্সের লেস আর্কস ফিল্ম ফেস্টিভালের ওয়ার্ক ইন প্রগ্রেস সেকশনে উপস্থাপিত হবে। পোস্ট প্রোডাকশন শেষ হবে ২০২৬ সালের মার্চে, এরপর শুরু হবে আন্তর্জাতিক উৎসবযাত্রা।
রুবাইয়াত হোসেনের আগের কাজগুলো—মেহেরজান, আন্ডার কনস্ট্রাকশন এবং মেড ইন বাংলাদেশ—যেভাবে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে, দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড ইতোমধ্যেই সেই ধারাবাহিকতার পরবর্তী উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শক্তিশালী নারীচরিত্র, প্রতীকী গল্পবলন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় নির্মাণ—সব মিলিয়ে ছবিটি ইতোমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।