রায়ের ঘোষণা
ইরানের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার জাফর পানাহিকে অনুপস্থিতিতে এক বছরের কারাদণ্ড ও দুই বছরের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তেহরানের বিপ্লবী আদালতের শাখা ২৬। তার আইনজীবী মোস্তফা নিলি সামাজিক মাধ্যমে জানান, আদালত তাকে রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠনে সদস্যপদ গ্রহণেও নিষিদ্ধ করেছে। রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণায় জড়িত থাকার অভিযোগে এই মামলা দায়ের করা হয়েছিল, যদিও অভিযোগের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। আইনজীবী জানিয়েছেন, তারা রায়ের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে আপিল করবেন।
মামলার পটভূমি ও অভিযোগ
সরকারবিরোধী বক্তব্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে রাষ্ট্রের সমালোচনামূলক বার্তা তুলে ধরাই তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব কর্মকাণ্ড দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর সমতুল্য। পানাহির অনুপস্থিতিতেই পুরো বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, কারণ রায় ঘোষণার সময় তিনি ইরানের বাইরে ছিলেন।
নির্মাতার প্রতিক্রিয়া ও সাম্প্রতিক অর্জন
রায় ঘোষণার একই দিনে নিউ ইয়র্কে গথম অ্যাওয়ার্ডসে তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট তিনটি পুরস্কার জিতে নেয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তিনি সব নিপীড়িত চলচ্চিত্রকারদের উদ্দেশে বলেন, “যারা নীরবে ক্যামেরা চালু রাখেন, কোনো সহায়তা ছাড়াই সত্য ও মানবিকতার ওপর বিশ্বাস রেখে কাজ করে যান, এই সম্মান তাদের জন্য।” ফ্রান্স ইতোমধ্যেই চলচ্চিত্রটিকে তাদের সরকারি অস্কার মনোনয়ন হিসেবে জমা দিয়েছে এবং ধারণা করা হচ্ছে, শিগগিরই এটি অস্কারের আন্তর্জাতিক ফিচার তালিকায় জায়গা পাবে।
কান উৎসবের শীর্ষ সম্মান
এই বছর কান চলচ্চিত্র উৎসবে পানাহির ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট পাম দ’অর জিতে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। চলচ্চিত্রটি পাঁচ সাবেক বন্দীর গল্প, যারা কারাগারে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো এক ব্যক্তির মুখোমুখি হলে প্রতিশোধ নেবেন কি না, সেই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারকে তুলে ধরে।
পানাহির অতীত গ্রেপ্তার ও সেন্সরশিপ ইতিহাস
এর আগে ২০১০ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন এবং সমালোচনামূলক সিনেমা নির্মাণের অভিযোগে তাকে ছয় বছরের কারাদণ্ড ও দীর্ঘমেয়াদি চলচ্চিত্র নির্মাণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। দুই মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান এবং নানা বাধা সত্ত্বেও দিস ইজ নট অ্যা ফিল্ম ও পরে ট্যাক্সি নামের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ২০২২ সালে সহকর্মী নির্মাতাদের আটককে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ জানাতে গেলে আবারও তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সাত মাস কারাভোগের পর মুক্তি পান।
পানাহি বারবার জানিয়েছেন, তিনি দেশত্যাগ করতে চান না। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ইরানের বাইরে আমি থাকতে পারি না। যা হওয়ার, ইতোমধ্যে আমার সঙ্গে সবই ঘটেছে।”
সরকারি রায়ের পরও বিশ্বমঞ্চে পানাহির সৃজনশীল বিজয় থামছে না। বহু নিষেধাজ্ঞা, বারবার গ্রেপ্তার, চলচ্চিত্র নির্মাণে বাধা—সবকিছুর মধ্যেও তিনি তার প্রতিবাদী ভাবনা, মানবিক গল্প বলার ঐতিহ্য এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরার শিল্পকৌশল ধরে রেখেছেন। তার বিরুদ্ধে নতুন রায়ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার সৃষ্টি করেছে, তবে একই সঙ্গে তার কাজকে আরও বেশি দৃশ্যমান করেছে।