নিজের চলচ্চিত্ররুচি ও বিতর্কিত মতের জন্য পরিচিত কুয়েন্টিন তারান্টিনো এবার জানালেন একবিংশ শতাব্দীর সেরা দশ সিনেমার ব্যক্তিগত তালিকা। ব্রেট ইস্টন এলিসের পডকাস্টে অতিথি হয়ে তিনি এই তালিকা প্রকাশ করেন, সঙ্গে দিয়েছেন কেন কোন ছবি তার কাছে আলাদা তা নিয়ে বেশ খোলামেলা ব্যাখ্যা। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে তার পছন্দের সেরা সিনেমাগুলোর মধ্যে যেমন আছে বড় স্টুডিওর যুদ্ধভিত্তিক অ্যাকশন, তেমনি আছে অ্যানিমেশন, রোমান্টিক ড্রামা আর হরর কমেডিও।
তারান্টিনোর তালিকায় এক নম্বরে জায়গা পেয়েছে রিডলি স্কট পরিচালিত যুদ্ধভিত্তিক ছবি ব্ল্যাক হক ডাউন। প্রথম দেখায় ছবিটির তীব্রতা তাকে পুরোপুরি আঁকড়ে ধরলেও, নিজের ভাষায় তিনি পরে বুঝেছেন এটি ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠা এক ধরনের মাস্টারওয়ার্ক। তার মতে, এই চলচ্চিত্রই একমাত্র ছবি যা আধুনিক সময়ে অ্যাপোক্যালিপস নাউ ধাঁচের উদ্দেশ্য, ভিজ্যুয়াল শক্তি ও অনুভূতির মাত্রায় পৌঁছাতে পেরেছে। দীর্ঘ সময় ধরে টানটান উত্তেজনা ধরে রাখার ক্ষমতাই তার চোখে ছবিটিকে শতাব্দীর সেরা করে তুলেছে।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে টয় স্টোরি থ্রি। অ্যানিমেশন হলেও এই ছবিকে তিনি দেখেছেন পূর্ণদৈর্ঘ্য আবেগঘন সিনেমা হিসেবে, যে ছবির চরিত্র ও বিদায়বেলার মুহূর্ত তার ভাষায় দর্শকের হৃদয় ভেঙে আবার জোড়া লাগায়। তৃতীয় স্থানে আছে সোফিয়া কপোলার লস্ট ইন ট্রান্সলেশন। এই ছবিকে তিনি এক নরম, নীরব অথচ গভীর প্রেম ও একাকিত্বের অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেছেন, যা ধীরে ধীরে দর্শকের ভেতর জায়গা করে নেয়।
চতুর্থ স্থানে রাখা হয়েছে ক্রিস্টোফার নোলানের যুদ্ধভিত্তিক ছবি ডানকার্ক, যার বর্ণনাভঙ্গি, সময়ের বিন্যাস এবং শব্দ চিত্রের সমন্বয় তার চোখে আক্রমণাত্মক ও ঝাঁকুনি দেওয়া ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। পঞ্চম স্থানে আছে পল টমাস অ্যান্ডারসনের দেয়ার উইল বি ব্লাড, যার শক্তির কেন্দ্র ড্যানিয়েল ডে লুইসের অভিনয়। যদিও এখানে সহশিল্পী পল ড্যানোকে ঘিরে তার সমালোচনা ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে, তবু ছবিটির সামগ্রিক নির্মাণ এবং চরিত্র নির্মাণের ঘনত্ব তাকে এই অবস্থানে তুলে ধরেছে।
ষষ্ঠ স্থানে ডেভিড ফিঞ্চারের জোডিয়াক, যা বাস্তব ঘটনার ওপর নির্মিত কিন্তু একই সঙ্গে এক ধরনের মানসিক থ্রিলারের আবহ তৈরি করে। সপ্তম স্থানে টনি স্কটের আনস্টপেবল, যা আপাতদৃষ্টিতে সরল অ্যাকশন থ্রিলার হলেও তারান্টিনোর মতে নিখুঁত গতি নিয়ন্ত্রণ ও উত্তেজনার ঘনত্বের জন্য বিশেষ উল্লেখযোগ্য। অষ্টম স্থানে জর্জ মিলারের ম্যাড ম্যাক্স ফিউরি রোড, যেটিকে তিনি সমকালীন অ্যাকশন সিনেমার ভিজ্যুয়াল মানদণ্ড নির্ধারণকারী কাজ হিসেবে দেখেন।
নবম স্থানে আছে এডগার রাইটের শন অব দ্য ডেড, যেখানে জম্বি ঘরানা আর ব্রিটিশ হিউমার মিশে সৃষ্টি করেছে এক ধরনের নতুন ঢঙের পপ কাল্ট ক্লাসিক। দশম স্থানে উডি অ্যালেনের মিডনাইট ইন প্যারিস। প্রথমদিকে এই ছবিতে ওউইন উইলসনের অভিনয় পছন্দ না হলেও, বারবার দেখার পর তারান্টিনো স্বীকার করেছেন চরিত্রটির সূক্ষ্মতা এবং চলচ্চিত্রটির সামগ্রিক আড্ডামুখর, নস্টালজিক মেজাজ তাকে ধীরে ধীরে জিতে নিয়েছে।
এই তালিকা থেকে আবারও পরিষ্কার হয়, তারান্টিনোর কাছে সিনেমা মানে কেবল শিল্প ভাবনা নয়, বিনোদন, বিস্ময় আর পরিচালকের ব্যক্তিত্বও সমান জরুরি। অ্যানিমেশন থেকে যুদ্ধের বাস্তবতা, ড্রামা থেকে হরর কমেডি, নানা ঘরানার এই দশ ছবির মাধ্যমে তিনি একবিংশ শতাব্দীর মূলধারার ভেতরেই নিজের পছন্দের এক আলাদা ইতিহাস লিখে রাখলেন।