বিলিয়ন ডলারের ঐতিহাসিক চুক্তি
হলিউডে দীর্ঘদিনের জল্পনার অবসান ঘটিয়ে নেটফ্লিক্স আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে, তারা ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির চলচ্চিত্র ও স্ট্রিমিং ব্যবসা কিনে নিচ্ছে প্রায় ৭২ বিলিয়ন ডলারে। ঋণসহ মোট মূল্য দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৮২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় বিনোদন ব্যবসার চুক্তিগুলোর একটি। প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্স ও কমকাস্টের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে চূড়ান্ত বিডার হিসেবে এগিয়ে এসেছে নেটফ্লিক্স। দুই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ইতোমধ্যেই সর্বসম্মতভাবে চুক্তি অনুমোদন করেছে।
কৌতূহল থেকে কেনার সিদ্ধান্তে নেটফ্লিক্স
প্রথম দিকে নেটফ্লিক্স প্রকাশ্যে বারবার জানাত, তারা বড় কোনো হলিউড স্টুডিও কেনার ইচ্ছে রাখে না। কিন্তু ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারি যখন ব্যবসা পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করে এবং স্টুডিও আর স্ট্রিমিং অংশকে আলাদা করে দেখার কথা ওঠে, তখন নেটফ্লিক্সের ভেতরে শুরু হয় ভিন্ন ধরনের আলোচন।
শুরুটা ছিল মূলত কৌতূহল থেকে। ওয়ার্নার ব্রাদার্সের শতবর্ষের স্টুডিও, এইচবিও আর এইচবিও ম্যাক্সের ব্যবসা কাঠামো বুঝতে গিয়েই নেটফ্লিক্স বুঝে যায়, এই প্রতিষ্ঠানকে নিজের ছাতার নিচে আনতে পারলে শুধু বিশাল কনটেন্ট লাইব্রেরিই পাওয়া যাবে না, বরং প্রযোজনা, বিতরণ আর থিয়েট্রিকাল রিলিজের মতো ক্ষেত্রেও তৈরি হবে শক্তিশালী সমন্বয়।
নিলামের মঞ্চে তিন প্রতিদ্বন্দ্বী
ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারির বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে নিলাম প্রক্রিয়া শুরু করে যখন প্যারামাউন্ট স্কাইড্যান্স সেপ্টেম্বরের মধ্যে একের পর এক প্রস্তাব দিতে থাকে। তাদের লক্ষ্য ছিল পুরো কোম্পানিটিই কেনা, যাতে কেবল নেটওয়ার্ক আর স্টুডিও একসঙ্গে ধরে রেখে বড় একটি মিডিয়া সাম্রাজ্য গড়া যায়।
একই সময় কমকাস্টও আগ্রহী ছিল তাদের এনবিসিইউনিভার্সাল এবং ওয়ার্নারের সম্পদ একত্র করে ডিজনি মানের আরেকটি জায়ান্ট তৈরি করতে। কিন্তু ঐ ধরনের সমন্বিত মর্জার বাস্তবায়ন করতে সময় লাগত অনেক বেশি, রাজনৈতিক আর বিধিবিধানগত ঝুঁকিও ছিল বেশি।
এই জায়গাটাতেই কৌশলে এগিয়ে যায় নেটফ্লিক্স। তারা শুধু স্টুডিও ও স্ট্রিমিং অংশটাই কিনতে চায়, বাকিটা আলাদা নেটওয়ার্ক ব্যবসা হিসেবে স্পিন অফ হয়ে যাবে। ফলে ডিলের কাঠামো হয় তুলনামূলক সহজ, দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য এবং বোর্ডের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণযোগ্য।
বোর্ডের প্রতিদিনের বৈঠক আর নেটফ্লিক্সের ‘প্রজেক্ট নোবেল’
অক্টোবরের শেষ দিকে নিলাম আনুষ্ঠানিক হওয়ার পর ওয়ার্নার ব্রাদার্সের বোর্ড কার্যত টানা কয়েক সপ্তাহ প্রতিদিনই বসেছে এই বিক্রির ভবিষ্যৎ নিয়ে। অন্যদিকে নেটফ্লিক্সের ভেতরে গোপনে চালু হয় বিশেষ অপারেশন, যার কোডনেম ছিল প্রজেক্ট নোবেল।
নেটফ্লিক্সের টপ ম্যানেজমেন্ট আর পরামর্শক ব্যাংকাররা প্রতি সকালে নিয়মিত কনফারেন্স কলে বসে ডিলের অগ্রগতি, অর্থের যোগান, আইনগত বাধা আর প্রতিদ্বন্দ্বীদের অবস্থান বিশ্লেষণ করেছে। থ্যাংকসগিভিং ছুটির মধ্যেও তারা কাজ থামায়নি।
এই পুরো সময়ে তারা হিসাব করে দেখিয়েছে, কীভাবে ওয়ার্নারের শতবর্ষের কনটেন্ট লাইব্রেরি, থিয়েট্রিকাল ডিস্ট্রিবিউশন ইউনিট আর এইচবিও ম্যাক্স প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সের বিদ্যমান গ্লোবাল সাবস্ক্রাইবার বেসের সঙ্গে মিলিয়ে দিলে দ্রুতই বাড়বে কনটেন্ট ব্যবহার ও আয়ের ধারা।
শেষ মুহূর্তের বিড আর সন্দেহ দূর করার কৌশল
ডিলের শেষ সপ্তাহে চাপ আরও বাড়ে যখন প্যারামাউন্ট তাদের প্রস্তাব বাড়িয়ে শেয়ারপ্রতি প্রায় ৩০ ডলার পর্যন্ত নিয়ে যায়। সংখ্যায় প্রস্তাবটি আকর্ষণীয় হলেও ওয়ার্নার বোর্ডের মধ্যে ছিল অর্থ জোগানের স্থায়িত্ব আর ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে সন্দেহ।
কমকাস্টের প্রস্তাবও ছিল বড়, কিন্তু তা বাস্তবায়নে সময় লাগত দীর্ঘকাল এবং সম্প্রচার নেটওয়ার্কের সঙ্গে স্টুডিও একীভূত করার জটিলতা ছিল অনেক বেশি।
এই পর্যায়ে নেটফ্লিক্স সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে সামনে আনে বিশাল ব্রেক আপ ফি। তারা অঙ্গীকার করে, কোনো কারণে যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন না মেলে বা ডিল ভেস্তে যায়, তাহলেও ওয়ার্নার ব্রাদার্স ডিসকভারিকে প্রায় ৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার গুনতে রাজি। এত বড় অঙ্কের ঝুঁকি নেওয়ার মধ্য দিয়ে তারা বোর্ডকে জানিয়ে দেয়, এই চুক্তি নিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস কেবল কথায় নয়, বাস্তব অঙ্গীকারেও প্রমাণিত।
কেন শেষ পর্যন্ত নেটফ্লিক্সই জিতল
অবশেষে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের বোর্ড যে কারণে নেটফ্লিক্সকে বেছে নিল, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিল তাৎক্ষণিক আর্থিক সুবিধা আর তুলনামূলক সহজ কাঠামো। নগদ অর্থ আর শেয়ারের সমন্বয়ে গড়া প্রস্তাব বোর্ডকে খুব দ্রুত বাজারে স্থিতিশীল বার্তা দিতে সাহায্য করে।
একই সঙ্গে নেটফ্লিক্স প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, স্টুডিওর বর্তমান প্রেক্ষাগৃহ প্রদর্শনের পরিকল্পনা সম্মান করবে এবং ওয়ার্নারের প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড ভ্যালু অক্ষুণ্ণ রাখবে। বোর্ডের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ শত বছরের এই ঐতিহ্য কেবল হিসাবের খাতায় সংখ্যা নয়, হলিউডের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
নেটফ্লিক্সের জন্য ‘সবচেয়ে বড় পুরস্কার’ কেন
এই অধিগ্রহণের মধ্য দিয়ে নেটফ্লিক্স শুধু আরেকটি স্টুডিও কিনল না, বরং নিয়ন্ত্রণে নিল এক বিশাল গল্পভাণ্ডার। শতবর্ষ ধরে গড়ে ওঠা চলচ্চিত্র ইতিহাস, এইচবিওর মর্যাদাপূর্ণ সিরিজ সংস্কৃতি আর সমকালীন ব্লকবাস্টার ফ্র্যাঞ্চাইজি এখন তাদের প্ল্যাটফর্মে নতুন করে সাজিয়ে দেওয়া যাবে।
স্ট্রিমিং বাজারে আগে থেকেই এগিয়ে থাকা নেটফ্লিক্স এখন প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় আরও দূরে চলে যাওয়ার সুযোগ পেল। শিল্প বিশ্লেষকেরা বলছেন, দর্শকের চোখে প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নেটফ্লিক্স এখন কার্যত হলিউডের সবচেয়ে বড় পুরস্কারই জিতে নিয়েছে, আর সেই পুরস্কার তারা পেয়েছে হিসাবি সাহস, কৌশলগত সময় নির্বাচন আর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ধৈর্য ধরে খেলা চালিয়ে যাওয়ার দক্ষতার জোরে।