নেটফ্লিক্সের হিট রোমান্টিক কমেডি সিরিজ ‘নোউবডি ওয়ান্টস দিস’ বাইরে থেকে যতটা মসৃণ ও ঝকঝকে, ভেতরের যাত্রা ছিল ঠিক ততটাই অস্থির ও অনিশ্চিত। ইহুদি প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই সিরিজে ক্রিস্টেন বেলকে দেখা যায় এক সংশয়ী সেক্স এবং রিলেশনশিপ পডকাস্টার হিসেবে আর অ্যাডাম ব্রডি অভিনয় করেছেন ঢিলেঢালা স্বভাবের এক রাব্বির চরিত্রে। আজকের দিনে যে সিরিজকে সবাই কালচারাল অবসেশন বলে ডাকছে, সেটি নির্মাণের সময় এক পর্যায়ে প্রায় ভেঙে পড়ার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল।
সিরিজটির স্রষ্টা এবং প্রথম মৌসুমের শো রানার এরিন ফস্টার আগে কখনও নাটকীয় সিরিজ পরিচালনা করেননি। তাঁর নিজের ইহুদি ধর্ম গ্রহণের অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি লিখেছিলেন একটি আধা জীবনীধর্মী গল্প। শুরুতে তিনি সিরিজটির নাম ভেবেছিলেন ‘শিক্সা’, কিন্তু নেটফ্লিক্স বৈশ্বিক দর্শকের কথা ভেবে নামটি পরিবর্তন করে রাখে ‘নোউবডি ওয়ান্টস দিস’। নামটাও তখন অনেককে ভড়কে দিয়েছিল, কারণ ব্যর্থ হলে সমালোচকদের শিরোনাম যেন নিজে নিজেই লেখা হয়ে যেত।
প্রথম মৌসুমের শুটিং চলাকালে পুরো প্রোডাকশন টিম প্রায়ই দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। স্ক্রিপ্ট শেষ মুহূর্তে বদলাতে হয়েছে, পুরো পর্ব বাতিল করে নতুন করে লেখা হয়েছে, টোন এবং গল্পের ধরন নিয়ে প্রযোজকদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে লড়াই করতে হয়েছে এরিন ফস্টারকে। একদিকে স্টুডিও এবং প্ল্যাটফর্মের নিরাপদ ভাবনা, অন্যদিকে নির্মাতার তীক্ষ্ণ এবং সম্পর্কভিত্তিক কমেডির স্বাদ ধরে রাখার চেষ্টা সব মিলিয়ে পরিবেশটা ছিল টানটান।
এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই ঠিক হলো প্রধান চরিত্রে অভিনয় করবেন ক্রিস্টেন বেল। এরিন শুরুতে নিজেই অভিনয় করার কথা ভাবলেও নেটফ্লিক্স চাইছিলেন আরও বড় মাপের তারকা। বেল কেবল অভিনয়েই যোগ দেননি, প্রযোজক হিসেবেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে জড়িত ছিলেন। তিনি শুরু থেকেই জোর দিয়ে অ্যাডাম ব্রডির নাম প্রস্তাব করেন, কারণ আগের কাজগুলোতে দুজনের রসায়ন যে কতটা স্বাভাবিক তা তিনি জানতেন। অনেক দ্বিধা দ্বন্দ্বের পর ব্রডি যখন রাজি হলেন, তখনও তিনি পুরো গল্পটা কোথায় যাবে সে বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন না, তবে লেখার ধার আর অভিনয়জুটি তাঁকে ঝুঁকি নিতে উৎসাহ দেয়।
শুটিং শেষ হওয়ার পরও দলের কেউ নিশ্চিত ছিলেন না শেষ ফলাফল কেমন দাঁড়াবে। কিন্তু নেটফ্লিক্সের অভ্যন্তরীণ সার্ভারে সিরিজটি উঠতেই কর্মীরা তা ধরে ফেলেন। প্রথম মৌসুম মুক্তির পর অবস্থা বদলে যায় এক লহমায়। দশ পর্বের সিজনটি টানা ছয় সপ্তাহ প্ল্যাটফর্মের টপ টেন তালিকায় থাকে, বছর শেষে মোট ভিউ ছাড়িয়ে যায় সাত কোটির কাছাকাছি, সঙ্গে পায় এমি, গোল্ডেন গ্লোব, এসএজি ও রাইটারস গিল্ডসহ বড় বড় পুরস্কারের মনোনয়ন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে সিরিজের ডায়লগ আর কিস সিনের মিম, আর ব্রডির চরিত্রের সংলাপ হয়ে ওঠে নতুন প্রজন্মের রোমান্টিক রেফারেন্স।
সাফল্যের সঙ্গে আসতে থাকে বিতর্কও। বিশেষ করে কিছু সমালোচনা ওঠে সিরিজে ইহুদি নারী চরিত্রগুলোর উপস্থাপন নিয়ে। লেখক হিসেবে এরিন ফস্টার মনে করেন, মূলধারায় এত বড় পরিসরে ইহুদি পরিবারকে কেন্দ্র করে গল্প আসাই বিরল, আর সেখানে দ্বন্দ্ব না থাকলে নাটকীয়তাও থাকত না। সহ শো রানার হিসেবে নতুন মৌসুমে যোগ দেওয়া জেনি কনার এবং ব্রুস এরিক ক্যাপলানও বলেছেন, তারা চরিত্রগুলোকে প্রতিনিধির চেয়ে মানুষ হিসেবে দেখতেই বেশি আগ্রহী, তাই অনলাইন প্রতিক্রিয়ার চেয়ে গল্পের ভেতরের সত্য থাকাই তাদের অগ্রাধিকার।
দ্বিতীয় মৌসুমের প্রস্তুতিতে তাই প্রোডাকশন কাঠামো গুছিয়ে নেওয়া হয়েছে অনেক বেশি সচেতনভাবে। শুটিং শুরু হওয়ার আগেই বেশির ভাগ পর্বের স্ক্রিপ্ট প্রস্তুত ছিল, লেখকদের রুমে এক ধরনের কাঠামো এবং সীমারেখা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। কনার এবং ক্যাপলান এরিনের স্বর এবং দৃষ্টিভঙ্গি অক্ষুণ্ণ রেখেই গল্পকে একটু ধীরে এবং গভীরভাবে এগিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ফলে নতুন মৌসুমে জোয়ান এবং নোয়ার সম্পর্কের উত্থান পতন, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং সেকেন্ডারি চরিত্রগুলোর বিবর্তন আরও বেশি সময় ও জায়গা পেয়েছে।
সিরিজটির মূল আকর্ষণ রয়ে গেছে ক্রিস্টেন বেল এবং অ্যাডাম ব্রডির অনস্ক্রিন রসায়ন। দর্শকরা যে ধরনের রোম্যান্স এবং কৌতুকের মিশেল প্রথম মৌসুমে পেয়েছেন, দ্বিতীয় মৌসুমেও সেই স্বাদ ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। নির্মাতারা বলেছেন, তারা অপ্রত্যাশিত ঘুরে দাঁড়ানো বা অযথা থ্রিলার মোড় আনতে চাননি, বরং সম্পর্ক এবং পারিবারিক জটিলতার ভেতরের ছোট ছোট সত্যকে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য ধরে রাখতে চেয়েছেন।
এখন দ্বিতীয় মৌসুম প্রকাশের আগমুহূর্তে সিরিজটির লেখক দল তৃতীয় মৌসুমের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে। হলিউডের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে যেখানে এক মৌসুম পরই বহু সিরিজ হারিয়ে যায়, সেখানে এত টানাপোড়েন পেরিয়ে ‘নোউবডি ওয়ান্টস দিস’ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে, তা নিজেই এক অনুপ্রেরণার গল্প। প্রযোজনা বিশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে কালচারের অংশ হয়ে ওঠা পর্যন্ত এই পথচলা নেটফ্লিক্সের সাম্প্রতিক কালের অন্যতম আলোচিত টেলিভিশন কাহিনি, যা দর্শকদের মতোই শিল্পের ভেতরের মানুষদের জন্যও এখন এক প্রয়োজনীয় পড়া।