হলিউডের বহুল আলোচিত মিউজিক্যাল সিক্যুয়েল ‘উইকেড ফর গুড’ নিয়ে সামনে এলো চমকে দেওয়ার মতো অন্তরালের গল্প। পরিচালক জন এম চু এবং প্রধান অভিনয়শিল্পী সিনথিয়া এরিভো ও আরিয়ানা গ্র্যান্ডের নেতৃত্বে ছবিটির শুটিং ছিল একই সঙ্গে দুঃসাধ্য এবং শিল্পসুলভ পরীক্ষা নিরীক্ষার এক বড় যাত্রা। ছবিটির পুরো ইউনিট জানাল, কাহিনি, সংগীত, অভিনয় এবং ভিজ্যুয়াল নির্মাণের প্রতিটি স্তর ছিল পরিশ্রম এবং সৃজনশীলতায় ভরপুর যা শেষ পর্যন্ত ব্রডওয়ের জনপ্রিয় মিউজিক্যালটিকে নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।
ছবির অন্যতম শক্তিশালী দৃশ্য ‘নো গুড ডিড’ গানটি ধারণ করতে সিনথিয়া এরিভোকে ঝুলন্ত হারনেসে থেকে বাস্তব আগুন এবং প্রবল বায়ুর বিপরীতে দাঁড়িয়ে সরাসরি গান গাইতে হয়েছে। শুটিং চলার সময় তিনি প্রায় আঠারো ফুট উঁচুতে উঠে আসেন এবং ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকেন। অভিনয়ের পাশাপাশি গান গাওয়ার এই কঠিন সমন্বয় ছিল তার জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা। সাউন্ড মিক্সার সাইমন হেজকে সতর্কভাবে কাজ করতে হয়েছে যাতে টুপি চাপা দেওয়া মাইক্রোফোনে বাতাস না লাগে।
প্রথম ছবির পুরো দলেরই ফিরে আসা ছিল দ্বিতীয় পর্বের মূল শক্তি। এলফাবা চরিত্রে এরিভো, গ্লিন্ডা হিসেবে গ্র্যান্ডে, পাশাপাশি জনাথন বেইলি, মিশেল ইয়ো, জেফ গোল্ডব্লাম সবাই তাদের চরিত্রে গভীরতায় ফিরে গেছেন। গল্পে দেখা যায় এলফাবার ন্যায়বোধ এবং রাগ ধীরে ধীরে তাকে বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে আর গ্লিন্ডা নিজের ভুল বুঝে আলোয় ফেরার পথ খুঁজছেন।
সবচেয়ে বড় সৃজনশীল সিদ্ধান্ত ছিল ছবিটিকে দুটি ভাগে তৈরি করা। পরিচালক চু জানালেন গল্পের আবেগ, দুই নারীর যাত্রা এবং তাদের পারস্পরিক বিশ্বাস ভাঙা ও জোড়া লাগার কাহিনি বিশ্বস্তভাবে তুলে ধরতে দুটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রই একমাত্র পথ ছিল। দ্বিতীয় ছবির চিত্রনাট্যে বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে গ্লিন্ডার অতীত এবং চরিত্রগত বিবর্তন যা লেখক উইনি হোল্জম্যান ও ডানা ফক্সকে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে সাহায্য করেছে।
দুটি ছবির শুটিং চলেছে একসঙ্গে এবং তা ছিল ইউনিটের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ। পরিচালক পুরো প্রক্রিয়াকে সামনে রেখে একটি নিরাপদ ওয়ার রুম তৈরি করেছিলেন যেখানে প্রতিটি দৃশ্যের রঙ, আবহ এবং নকশা সাজানো ছিল ধারাবাহিকভাবে। প্রথম ছবির শেষাবধি দীর্ঘ সূর্যাস্ত আর দ্বিতীয় ছবির বেশির ভাগ দৃশ্য অন্ধকারে হওয়ায় দুই অংশের ভিজ্যুয়াল ভাবেও ছিল সুস্পষ্ট পার্থক্য।
অভিনেতাদের চরিত্র নির্মাণও ছিল বিশেষ প্রস্তুতির। গ্র্যান্ডে এবং এরিভো নিজেদের বিশাল নোট করা স্ক্রিপ্ট সামলেছেন, আলাদা আলাদা সুগন্ধি ব্যবহার করেছেন কোথায় কোন মানসিক অবস্থায় আছেন তা ধরে রাখতে। সংগীত পরিচালক স্টিফেন শোয়ার্টজ দ্বিতীয় ছবির জন্য দুটি নতুন গান লিখেছেন যার মধ্যে ‘নো প্লেস লাইক হোম’ এলফাবার হৃদয়ের ভাঙন আর আত্ম উপলব্ধির মুহূর্তকে গভীর করেছে। ‘দ্য গার্ল ইন দ্য বাবল’ গ্লিন্ডার জাগরণের মুহূর্তকে তুলে ধরেছে।
প্রায় পুরো ছবিতেই শিল্পীরা লাইভ গেয়েছেন। সেটে রাখা পিয়ানো থেকে ইয়ারপিসে সংগীত পৌঁছানো হতো এবং অভিনেতারা নিজের ছন্দে গান ধরতেন। মেকআপেও ছিল দারুণ কারুকাজ। এলফাবার সবুজ ত্বক তৈরি করতে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগত এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চেহারার ছায়া বদলে যেত। পোশাকের নকশাও চরিত্রের বিবর্তনের সঙ্গে ভেঙে ভেঙে গড়েছে।
দৃশ্যায়নে ব্যবহার করা হয়েছে বড় আকারের সেট। এলফাবার গোপন আশ্রয়স্থল তৈরি করতে কাঠ, ডালপালা এবং জীবন্ত উদ্ভিদ দিয়ে এক বিশাল বাসার মতো অবকাঠামো বানানো হয় স্টুডিওর ভেতরেই। নরফোকের মাঠে লাগানো হয় নয় মিলিয়ন রঙিন টিউলিপ।
ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের কাজও ছিল ব্যাপক। বাতাসের ঝড়, আয়নায় প্রতিফলনের জটিলতা, এলফাবার উড্ডয়ন—সব মিলিয়ে চলচ্চিত্রটিতে ব্যবহৃত ভিএফএক্স শটের সংখ্যা ১৮০০ এর বেশি।
সবচেয়ে আবেগপ্রবণ মুহূর্ত ছিল শেষ গান ‘ফর গুড’ ধারণ করা। প্রথমে দৃশ্যটিকে আরও শক্তিশালী করার কথা ভাবা হলেও শুটিং শুরু হওয়ার পর পরিবেশের আবেগ পরিচালককে প্রভাবিত করে এবং দৃশ্যটি শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে ত্যাগ, বন্ধুত্ব এবং নতুন শক্তি অর্জনের এক নীরব ও গভীর দৃশ্য।
‘উইকেড ফর গুড’ শুধু একটি সিক্যুয়েল নয় বরং দুই নারীর আত্ম আবিষ্কার, সংগ্রাম, ভালোবাসা ও সাহসের গল্পকে নতুন ভাষায় বলার বড় প্রয়াস। নির্মাণের প্রতিটি স্তরে যে শ্রম, ভালোবাসা এবং নন্দনচিন্তার ছাপ রয়েছে তা ছবিটিকে ব্রডওয়ে থেকে পর্দায় আনার যাত্রাকে আরও তাৎপর্যময় করেছে।