বিশ্বজুড়ে রেগে সংগীতকে জনপ্রিয় করা জ্যামাইকান কিংবদন্তি জিমি ক্লিফ আর নেই। সোমবার ৮১ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় ক্লিফের স্ত্রী লতিফা চেম্বার্স জানান, খিঁচুনি ও পরবর্তী নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তিনি স্বামীকে স্মরণ করে বিশ্বব্যাপী ভক্ত, সহশিল্পী ও সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছেন, সবার ভালোবাসাই ছিল জিমি ক্লিফের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শক্তি।
১৯৪৪ সালে জ্যামাইকার সেন্ট জেমস প্যারিশের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন জেমস চেম্বার্স, পরে যিনি জিমি ক্লিফ নামে পরিচিত হন। ঘূর্ণিঝড়ের রাতে জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর শৈশব কাটে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। ছোটবেলা থেকেই চার্চে গান গাইতেন, কিশোর বয়সে নিজের নাম বদলে ‘ক্লিফ’ রাখেন, উচ্চতায় ওঠার স্বপ্নের প্রতীক হিসেবে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে রাজধানী কিংস্টনে চলে এসে ‘হারিকেন হ্যাটি’ গান দিয়ে জ্যামাইকার চার্টের শীর্ষে উঠে আসেন।
ষাটের দশকে স্কা আর রেগে ঘরানায় একের পর এক জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে তিনি দ্রুতই দেশের প্রথম সারির তারকায় পরিণত হন। ১৯৬০–এর দশকের শেষদিকে লন্ডনে গিয়ে আইল্যান্ড রেকর্ডসের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। ‘ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্ল্ড, বিউটিফুল পিপল’, ‘ভিয়েতনাম’, ‘ইউ ক্যান গেট ইট ইফ ইউ রিয়েলি ওয়ান্ট’—এসব গানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে রেগে সংগীতের একটি নতুন দরজা খুলে দেন তিনি। বব ডিলান ‘ভিয়েতনাম’–কে সমকালীন সেরা প্রতিবাদী গানগুলোর একটি হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।
সংগীতের পাশাপাশি ক্লিফের অভিনয়ও বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসে ১৯৭২ সালের ‘দ্য হার্ডার দে কাম’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে। জ্যামাইকার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা হিসেবে পরিচিত এই ক্রাইম ড্রামায় তিনি আইভান মার্টিন নামে এক গায়ক–অপরাধীর চরিত্রে অভিনয় করেন। গানের স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম থেকে কিংস্টনে আসা যে তরুণ শোষণ আর বঞ্চনা সহ্য করতে না পেরে অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়ে, সেই গল্পই ছিল ছবির মূল সুর। সিনেমাটি এবং এর সাউন্ডট্র্যাক যুক্তরাষ্ট্রে রেগে সংগীতকে মূলধারার শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেয়; পরের বছরই বব মার্লির অ্যালবাম প্রথমবার মার্কিন চার্টে প্রবেশ করে।
‘দ্য হার্ডার দে কাম’ সিনেমার একই শিরোনামের গানসহ ‘মেনি রিভারস টু ক্রস’, ‘ইউ ক্যান গেট ইট ইফ ইউ রিয়েলি ওয়ান্ট’—এসব গান রেগে ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। ১৯৯৩ সালে ডিজনি ছবির ‘কুল রানিংস’-এর জন্য গাওয়া ‘আই ক্যান সি ক্লিয়ারলি নাও’–এর কাভার সংস্করণ আবারও তাঁকে নতুন প্রজন্মের শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেয়। কয়েক দশকজুড়ে তিনি রোলিং স্টোনস, এলভিস কস্টেলো, অ্যানি লেনক্স, পল সাইমনসহ বিশ্বের বহু নামী শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছেন।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বহু পুরস্কার ও স্বীকৃতি পেয়েছেন জিমি ক্লিফ। ২০১০ সালে তিনি ‘রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেম’-এ অন্তর্ভুক্ত হন; বব মার্লের পর দ্বিতীয় জ্যামাইকান শিল্পী হিসেবে এই বিরল সম্মান অর্জন করেন। আরও আগে, ২০০৩ সালে দেশটির তৃতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘অর্ডার অব মেরিট’ পান তিনি—জ্যামাইকার সংগীত ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ।
জিমি ক্লিফের মৃত্যুতে জ্যামাইকা সরকার গভীর শোক প্রকাশ করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ড্রু হোলনেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে “সত্যিকারের সাংস্কৃতিক মহীরুহ” আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ক্লিফের সংগীত জ্যামাইকার হৃদয় ও ইতিহাসকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে। আফ্রিকা থেকে লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ থেকে উত্তর আমেরিকা—অসচ্ছল ও প্রান্তিক মানুষের সংগ্রাম, বেদনা ও আশার কথা বহন করে তাঁর গান আজও নানা প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।
জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি মঞ্চে সক্রিয় ছিলেন; গ্লাস্টনবারি থেকে কোচেল্লা—বিভিন্ন উৎসবে বাজিয়ে নতুন নতুন শ্রোতাকে রেগে–র জগতে টেনে এনেছেন। নিজের সাফল্যের ব্যাখ্যায় তিনি একবার বলেছিলেন, কোনো শ্রোতা যদি এসে বলে—আপনার গান শুনে আমি হাল না ছেড়ে আবার নতুন করে শুরু করেছি, সেটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার। কিংবদন্তি এই শিল্পীর বিদায়ে রেগে সংগীত এক অনন্য কণ্ঠস্বর হারাল, তবে তাঁর গানে উচ্চারিত আশা ও প্রতিরোধের ভাষা সময়ের সীমানা পেরিয়ে আরও বহুদিন বেঁচে থাকবে।